আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সতর্কবার্তা

ডটকম বাবলের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা, বড় ধসের মুখে পড়তে পারে এআই-নির্ভর শেয়ারবাজার

বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারগুলোর সাম্প্রতিক উত্থানে মূল চালিকাশক্তির ভূমিকায় রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বড় ধরনের উত্থান।

বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারগুলোর সাম্প্রতিক উত্থানে মূল চালিকাশক্তির ভূমিকায় রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বড় ধরনের উত্থান। এতে রাতারাতি শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা ব্যাপক মাত্রায় বাড়লেও এর সঙ্গে বেড়েছে বাজার ধসের আশঙ্কা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই) সতর্ক করে বলেছে, বাজার এখন ২০০০-এর শুরুর দশকের ডটকম বাবলের পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। খবর এফটি।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ইন্টারনেটের দ্রুত প্রসার ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উত্থানের কারণে বিনিয়োগকারীরা খাতটির শেয়ারে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেন। কিন্তু ২০০০-২০০১ সাল নাগাদ দেখা যায়, এসব কোম্পানির অনেকগুলোই শেয়ারবাজারে অতিমাত্রায় মূল্যায়িত হয়েছে। সে সময় বাজারে বড় আকারের পতন শুরু হয়। এ ঘটনা পরবর্তী সময় আখ্যা পায় ‘ডটকম বাবল’ হিসেবে।

ওয়াশিংটনে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সংস্থাটির চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বলেন, ‘এআইর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রবল আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এটি হঠাৎ করেই উল্টে যেতে পারে। সে আঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।’

ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘আজকের বাজার পরিস্থিতি ২৫ বছর আগের সেই ইন্টারনেট সংক্রান্ত উচ্ছ্বাসের সময়কার স্তরের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।’

একই দিনে প্রায় একই সতর্কবার্তা দেয় ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের (বিওই) ফাইন্যান্সিয়াল পলিসি কমিটি। ডটকম বাবল-পরবর্তী বাজার ধসের সঙ্গে তুলনা করে কমিটি বলেছে, বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে হঠাৎ পতনের ঝুঁকি বেড়েছে।

এআই-নির্ভর শেয়ারবাজার নিয়ে সতর্কবার্তা নতুন নয়। তবে আইএমএফ ও বিওই থেকে আসা বক্তব্যগুলোই এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা। ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘এআই নিয়ে আশাবাদ বাজারকে চাঙ্গা করে তুলেছে এবং তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও কিছুটা সহায়তা দিয়েছে। তবে শেয়ারমূল্যের আকস্মিক পতনে বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমতে পারে, অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বল দিকগুলোকে প্রকাশ করে দিতে পারে এবং বিশ্বের বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরিস্থিতি কঠিন করে তুলতে পারে।’

একই ভাষায় যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বাজারে তীব্র পতনের ঝুঁকি বেড়েছে। মার্কিন শেয়ারের সাইক্লিক্যালি অ্যাডজাস্টেড প্রাইস-টু-আর্নিংস রেশিও (সিএপিই রেশিও) এখন প্রায় ২৫ বছর আগের ডটকম বাবলের সময়কার স্তরের কাছাকাছি।

যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ কোম্পানিগুলোর সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ বর্তমানে আগামী এক বছরের অনুমিত আয়ের তুলনায় ২৫ গুণ দামে লেনদেন হচ্ছে। সূচকটি চলতি বছরের এখন পর্যন্ত ১৪ শতাংশ বেড়েছে। গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণার পর পতন ঘটলেও দ্রুত বাজার পুনরুদ্ধার করে।

যদিও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো মনে করছে এ সতর্কবার্তা অমূলক। চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানি এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং বলেন, ‘ডটকম বাবলের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা বর্তমান এআই বুম। কারণ মাইক্রোসফট, গুগল ও মেটার মতো এখনকার হাইপারস্কেলার প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে ওই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।’

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) কর্মকর্তারাও পুঁজিবাজারে বড় ধসের আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। সান ফ্রান্সিসকো ফেডের প্রধান মেরি ড্যালি বলেছেন, ‘এআই বাবল আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি নয়। গবেষণা ও অর্থনীতি একে ভালো বাবল হিসেবে দেখে, যেখানে প্রচুর বিনিয়োগ হচ্ছে। এমনকি যদি বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিক উৎসাহ অনুযায়ী পুরো মুনাফা নাও পান, তবুও এর ফল শূন্য হয় না; বরং উৎপাদনশীল কিছু রেখে যায়।’

বিওই বলছে, বাজারের উল্টো দিকে ঘুরে যাওয়ার ঝুঁকি আরো বেড়েছে। কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি ঋণ খাতে খেলাপি হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এ থেকে বাজারভিত্তিক অর্থায়নে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

মার্কিন ফেডের ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধিও শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছে বিওই। তারা বলছে, এতে ডলারনির্ভর সম্পদের মূল্যে হঠাৎ অবমূল্যায়ন ঘটাতে পারে। পাশাপাশি ফ্রান্স ও জাপানে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ঋণবাজারকে নড়বড়ে করে তুলতে পারে।

আরো বলা হচ্ছে, এআই-নির্ভর শেয়ারমূল্য সংশোধন ঘটলে এর অভিঘাত এখন আরো বেশি হবে, কারণ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাজার অংশীদারত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বর্তমানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের শীর্ষ পাঁচটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে প্রায় বাজারের ৩০ শতাংশ দখল করে রেখেছে, যা হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাজার হিস্যা দখলের হিসাবে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ।

সম্প্রতি বিশেষ একটি ঘটনায় অস্থির হয়ে উঠেছে মার্কিন ঋণবাজার। সাবপ্রাইম গাড়ি ঋণদাতা ট্রাইকালার ও গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী ফার্স্ট ব্র্যান্ডস ঋণ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কোম্পানি দুটি প্রধানত বেসরকারি ঋণ ও ইনভয়েস ফাইন্যান্সিংয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিওই বলছে, এসব ঘটনা সেই ঝুঁকিগুলোকেই জোরদার করে, যেগুলো আমরা আগে তুলে ধরেছিলাম। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ ঋণ, দুর্বল ঋণ অনুমোদন নীতি, অস্বচ্ছতা ও জটিল আর্থিক কাঠামো। ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপদ ঋণের সুদহারের ব্যবধান বর্তমানে ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন স্তরের কাছাকাছি চলে এসেছে।

অন্যদিকে ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার মতে, ‘এআই বুম ও ডলারের দুর্বলতা সামগ্রিকভাবে আর্থিক পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে উদীপ্ত করেছে। আমরা দেখছি চলতি বছর ও আগামী বছরে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি সামান্য কমলেও সার্বিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতি একাধিক ধাক্কা সামলেও স্থিতিশীল রয়েছে।’

আরও